ক্ষুব্ধ আত্মসমর্পণকারী দস্যুরা : প্রতিশ্রুতির পাঁচ বছরেও মুক্তি মেলেনি মামলা থেকে

রিপোর্টার নামঃ
  • মঙ্গলবার, ২ নভেম্বর, ২০২১
  • ২০৪ বার পড়া হয়েছে

নিউজ ডেস্ক :: দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সুন্দরবনে ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন। তিনি ‘বড় ভাই বাহিনী’র অন্যতম সদস্য ছিলেন। সুন্দরবনে আসা পর্যটক ও জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল এই বাহিনীর কাজ। এসব অপকর্ম করতে গিয়ে সমাজচ্যুত হয়েছিলেন। পরে পরিবার ও সমাজের কথা চিন্তা করে ২০১৮ সালে র‌্যাবের আহ্বানে আত্মসমর্পণ করেন ইদ্রিস আলী। কিন্তু তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো প্রত্যাহার না হওয়ায় আতঙ্কগ্রস্ত তিনি। এমনকি পুলিশেরও হয়রানির শিকার হয়েছেন। পুলিশের চাহিদা অনুযায়ী ১ লাখ টাকা দিতে না পারায় বছরখানেক জেলও খাটতে হয়েছে তাকে।

একই দশা নাজিম শেখ নামে আরেক জলদস্যুর। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ৫ বছর সুন্দরবনে নানা অপকর্ম চালিয়েছেন। তিনি ‘রাজু বাহিনী’র অন্যতম সদস্য ছিলেন। তবে অপরাধ করলেও তিনি তার তিন সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিত করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি আত্মসমর্পণ করলেও এখনও তার কোনো মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ তিনি।

এই দুজনের মতোই আত্মসমর্পণ করা ৩২৫ জলদস্যুর একই দশা। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা দ্রুত প্রত্যাহারে দাবি জানিয়েছেন তারা। সোমবার দুপুরে বাগেরহাটের রামপালে ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন ও আত্মসমর্পণকৃত জলদস্যু পুনর্বাসন’ অনুষ্ঠানে সময়ের আলোর কাছে এসব অভিযোগ করেন সাবেক জলদস্যুদের অনেকেই। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুরা বলেন, প্রতিশ্রুতির পর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও মামলা থেকে মুক্তি মেলেনি। আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে সঠিক পথে আয়ের একটি বড় অংশ ঢালতে হচ্ছে সরকারবাদী মামলার পেছনে। অর্থ সঙ্কটে অনেকেই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। ৩২৫ জনের অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের হয়রানিতে বেকায়দায় রয়েছেন তারা।

এখন তাদের একটাই দাবি- দস্যুতার কারণে দায়ের হওয়া মামলা থেকে যেন তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। এক সময়ে সুন্দরবনের মূর্তিমান আতঙ্ক ‘মাস্টার বাহিনী’র প্রধান মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টার। তিনি বলেন, কখনও প্রতিপক্ষ আবার কখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আতঙ্কে দিন কাটত। ছেলেমেয়ে, মা-বাবার মুখ দেখতে পারতাম না। গ্রামে আসতে পারতাম না।

মোস্তফা শেখ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক সহযোগিতার কারণে আমার এক যুগের দস্যুতার জীবনের সমাপ্তি হয়। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলার কারণে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারছি না। পুলিশের আতঙ্ক আর মামলার ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমাদের স্বাভাবিকভাবে জীবন কাটানো এখন অনেক কষ্টদায়ক।

সাবেক জলদস্যু মাস্টার বাহিনীর প্রধান আরও বলেন, একটা সময়ে আমার এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যে মামলা থেকে বাঁচতে দস্যুজীবন বেছে নেই। এই জীবনে আয় ভালো থাকলেও অজানা আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াত। আর এখন দস্যুতা ছেড়ে দেওয়ার পরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তের জীবন পেয়েছি। কিন্তু মামলার কারণে শুরু হয়েছে আরেক আতঙ্ক। আত্মসমর্পণের সময়ে সরকার আমাদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো করেছিল সেগুলো এক বছরের মধ্যে প্রত্যাহার করার কথা দিয়েছিল। কিন্তু আত্মসমর্পণের তিন বছর পরও মামলার আসামি থেকে গেলাম।

সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় দস্যুদল তার ছিল দাবি করে মোস্তফা শেখ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমার দলের ৯ সদস্য নিয়ে ৫২টি অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করি। আমার দল ছিল অনেক বড়, কিন্তু সবাই সাহস করেনি। তবে আমরা আত্মসমর্পণ করার একে একে সবাই দস্যুতা ছেড়ে দিয়ে সাধারণ জীবনে ফিরে এসেছি। দস্যুতা ছেড়ে ভালোই ছিলাম। নতুন জীবন পেয়ে একটি দোকান দিয়েছিলাম। কিন্তু মামলার কারণে এখন বাড়িতে থাকতে পারছি না। আমার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি ওয়ারেন্ট রয়েছে। পালিয়ে বেড়ানোর কারণে দুই বছর ধরে দোকান বন্ধ। এখন আবার সেই পালানোর জীবন চলছে। সরকার আমাদের অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। কিন্তু মামলা থেকে মুক্তি না দিলে আমাদের জীবনে সুখ ফিরবে না। এটা শুধু আমার কথা নয়। দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সাবেক জলদস্যুদের এই একটাই দাবি।

দস্যুতার জীবন সমাপ্তির ৩ বছর পর কেমন আছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তফা শেখ বলেন, ভালো নেই বলব না, তা হলে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু আমাদের প্রথম চাওয়া হলো মামলা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যেই এটা করব।

২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন জলদস্যু ৪৬২টি অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। এই তিনজনের মধ্যে দুজন আত্মসমর্পণের পর আবারও দস্যুপনায় জড়িয়ে পড়ায় একপর্যায়ে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আরেকজন বার্ধক্যের কারণে মারা গেছেন।

পুলিশ ও র‌্যাবের দুই কর্মকর্তা বলেন, জলদস্যুরা দীর্ঘদিন ধরেই পুরো সুন্দরবন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাত। তারা জেলে-মাঝি ও পর্যটকদের জিম্মি করে সর্বস্ব লুটে নিত। দিনের পর দিন তাদের তাণ্ডবে দিশেহারা ছিল স্থানীয় প্রশাসন। আবার তাদের ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী মহল আর্থিকভাবে ছিল লাভবান। ২০১২ সালে র‌্যাব মহাপরিচালককে প্রধান করে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে তৎকালীন র‌্যাব মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ (বর্তমান আইজিপি) জলদস্যুদের লাগাম টেনে ধরার উদ্যোগ নেন। র‌্যাবের একের পর এক অভিযানে দিশেহারা হয়ে পড়ে জলদস্যুরা। অভিযানে ফেরারি জীবনের অবসান ঘটিয়ে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন তারা।

এদিকে ইতঃপূর্বে আত্মসমর্পণকারী জল-বনদস্যুদের পুনর্বাসনে ঘর, মুদি দোকান, নৌকা, জাল ও গবাদিপশু হস্তান্তর করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব পুনর্বাসন উপহার বিতরণ করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুষ্ঠানে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমি বাগেরহাটে এসেই শুনেছি, বিশ্বাস করিনি। শুনেছি কেউ কেউ আবার বিপথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কষ্ট করছেন জানি। কিন্তু ভুলেও সে চেষ্টা পুনরায় করবেন না। তিনি বলেন, আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের মামলার বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, ধর্ষণ ও খুন ছাড়া সব মামলা পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে।

র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য গোরিয়া ঝর্ণা সরকার, এ ছাড়াও খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. শামসুল হক টুকু, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. হাবিবুর রহমান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পীর ফজলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

আরো সংবাদ পড়ুন
© All rights reserved © 2021 Anushondhan News
Developed by Host for Domain