ক্রীড়া ডেস্ক ::: নেইমার জুনিয়র কাঁদছেন! তাকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে এসেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। কিন্তু ভিনিসিয়ুসকে সান্ত্বনা দেবে কে? ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে অনেকটাই একাই লড়ে গেলেন এই উইঙ্গার। কিন্তু রোববার (৫ জুলাই) বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ২টার ম্যাচে কিছুতেই কিছু হলো না।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে সবাইকে একাই ছায়ায় ঢেকে দিলেন অবিশ্বাস্য আর্লিং হলান্ড। তার জোড়া গোলেই নরওয়ের কাছে ২–১ গোলে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
অন্যদিকে নরওয়ে গড়েছে নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে এটিই তাদের সেরা সাফল্য। সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এবার তাদের প্রতিপক্ষ সোমবার (৬ জুলাই) ভোরের ম্যাচে মেক্সিকোকে হারানো ইংল্যান্ড।
সুযোগ এসেছিল শুরুতেই, তবে স্পট কিকে ব্যর্থ হলেন ব্রুনো গিমারাইস। পরে লম্বা সময় আক্রমণে আধিপত্য করল ব্রাজিল। কিন্তু শেষটায় জ্বলে উঠলেন আর্লিং হলান্ড। দুমড়ে মুচড়ে গেল ব্রাজিলের সব স্বপ্ন। অসাধারণ এক জয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠল নরওয়ে।
চলতি আসরের আগে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নরওয়ের কোনো জয় ছিল না, তারাই এবার জিতল টানা দুটি ম্যাচ। প্রথমবারের মতো উঠল কোয়ার্টার-ফাইনালে।
নরওয়ের এই স্মরণীয় সাফল্যের মূল নায়ক হলান্ড। তবে, ম্যাচ জুড়ে দুর্দান্ত সব সেভ করে পার্শ্বনায়ক অবশ্যই গোলরক্ষক আরিয়ান হশল নিলাদ। শুরুতেই ব্রুনো গিমারাইসের পেনাল্টি শট আটকে প্রতিপক্ষকে বড় একটা ধাক্কা দেন তিনি। যেখান থেকে আর সাফল্যের পথের দেখা পায়নি পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
ক্লাব ফুটবলের অবিশ্বাস্য সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তির কোচিংয়ে বিশ্বকাপের শিরোপা খরা কাটানোর স্বপ্ন দেখছিল সেলেসাওরা। দলে দারুণ সব ফুটবলারের সমাহারও ছিল তাদের; কিন্তু বিশ্ব জয়ের মতো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত দল তারা হয়ে উঠতে পারেনি।
চোট কাটিয়ে পূর্ণ ফিটনেস পাওয়ার লড়াইয়ে থাকা নেইমার দলকে উদ্ধার করতে মাঠে নামলেন, কিন্তু পারলেন না দলকে বাঁচাতে। শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে জালের দেখা অবশ্য পেলেন তিনি, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কেবল ৩০ শতাংশের একটু বেশি সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ১৪টি শট নিয়ে চারটি লক্ষ্যে রাখতে পারে ব্রাজিল। নরওয়ের ৯ শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।
ভয়ডরহীন নরওয়ে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তারই একটা ইঙ্গিত যেন মেলে ম্যাচের শুরুতেই। তৃতীয় মিনিটে গতিময় আক্রমণে ডি-বক্সের মুখ থেকে জোরাল শটে জালে বল পাঠান পাত্রিক বার্গ, তবে অফসাইডের পতাকা ওঠায় সেই যাত্রায় বেঁচে যায় ব্রাজিল।
সাত মিনিট পর অন্য পাশে দারুণ এক আক্রমণ শাণায় ব্রাজিল। গোলের সুবর্ণ সুযোগও পায় তারা; কিন্তু সফল হতে পারেনি।
তবে ডি-বক্সে মাতেউস কুইয়াকে ফাউল করেন ডিফেন্ডার ক্রিস্তোফের আয়ের। শুরুতে রেফারির চোখ এড়িয়ে গেলেও, ভিএআরের পরামর্শে মনিটরে দেখে পেনাল্টি দেন রেফারি। প্রথমে ভিনিসিউস জুনিয়র শট নেবেন মনে হলেও, শট নেন ব্রুনো গিমারাইস এবং তার নিচু স্পট কিক ঝাঁপিয়ে রুখে দেন আরিয়ান হশল নিলাদ।
বেশিরভাগ সময় পজেশন রেখে বাররার আক্রমণে উঠলেও, উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারছিল না নরওয়ে। ৩৫তম মিনিটে গোলের জন্য প্রথম বৈধ শট নিতে পারে তারা; তবে মার্টিন ওদেগোরের শটটি পাশের জাল কাঁপায়। দুই মিনিটের মধ্যে লক্ষ্যে প্রথম শট নেন হলান্ড, যদিও তার দুর্বল ভলি জমে যায় আলিসনের গ্লাভসে।
খানিক পর ডি-বক্সে দুজনকে কাটিয়ে শট নেন ভিনিসিউস, পা দিয়ে আটকান নিলাদ। প্রথমার্ধের ছয় মিনিট যোগ করা সময়ে দুই দলই এগিয়ে যাওয়ার পরিষ্কার সুযোগ পায়।
প্রথমে ডি-বক্সে ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডার হলান্ডকে আটকাতে গিয়ে বল হারিয়ে ফেলে এবং আলগা বল ধরে শট নেন ওদেগোর, ঝাঁপিয়ে কোনোমতো আটকান আলিসন। পাল্টা আক্রমণে ছয় গজ বক্সে অসাধারণ এক ক্রস বাড়ান কাসেমিরো, অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে বলের লাইনে পৌছেও যান গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, কিন্তু বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৫ মিনিটে দারুণ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে ব্রাজিল, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা হয় সঙ্গী। এই সময়ে সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পান ৫৮তম মিনিটে কুইয়ার বদলি নামা এন্দ্রিক। পরের মিনিটেই প্রতি-আক্রমণে বাঁ দিক থেকে ডি-বক্সের বাইরে দুর্দান্ত এক থ্রু বল বাড়ান ভিনিসিউস। বল ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণেও নেন তরুণ ফরোয়ার্ড; কিন্তু ওয়ান-অন-ওয়ানে এগিয়ে আসা গোলরক্ষকের চ্যালেঞ্জের মুখে লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন তিনি।
তিন মিনিট পর আবার গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে রক্ষা নরওয়ের। ডি-বক্সের মুখ থেকে হায়ানের শট দারুণ ক্ষিপ্রতায় রুখে দেন নিলাদ। পরের কয়েক মিনিটে ভালো দুটি আক্রমণ করে নরওয়ে, যদিও আলিসনের তেমন পরীক্ষা নিতে পারেনি কেউ।
এরপরই, ৬৭তম মিনিটে জোড়া পরিবর্তন করেন আনচেলত্তি; মার্তিনেল্লি ও হায়ানকে তুলে নেইমার ও দানিলো সান্তোসকে নামান কোচ। তারা কেউই অবশ্য দলকে বাঁচাতে পারেননি।
৭৯তম মিনিটে স্বরূপে হাজির হন হলান্ড এবং বাঁ দিক থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরিপের ক্রস ছয় গজ বক্সের বাইরে পেয়ে, সবার ওপরে লাফিয়ে হেডে ব্রাজিলকে হতভম্ব করে দেন দিনি। তার পাশেই ছিলেন গাব্রিয়েল মাগালাইস, কিন্তু তিনি পারেননি প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে।
জাতীয় দলের হয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে জালের দেখা পেলেন হলান্ড। অষ্টম ইউরোপিয়ান ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম চার ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়লেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার।
পরের পাঁচ মিনিটে আরও দুটি দারুণ সেভ করেন নিলাদ। এন্দ্রিকের শট আয়েরের পায়ে লেগে ক্রসবার ঘেঁষে জালে জড়াতে যাচ্ছিল, অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় সেটা রুখে দেন নিলাদ।
এরপরই, নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে ব্রাজিলের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা শেষ করে দেন হলান্ড। ডি-বক্সের বাইরে থেকে, আচমকা নিচু জোরাল শটে আলিসনকে পরাস্ত করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই নিয়ে সবশেষ ১৪ ম্যাচে ২৭টি গোল করলেন হলান্ড। চলতি আসরে গোল্ডেন বুটের লড়াইটা জমে উঠল আরও। কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসির সমান সাতটি গোল করলেন হলান্ড।
আট মিনিট যোগ করা সময়ের শেষ দিকে কাসেমিরো ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। এবং সফল স্পট কিকে বিশ্বকাপে আরেকটি গোল পাওয়ার হাসি ফুটে ওঠে নেইমারের মুখে।
তবে, ম্যাচের চিত্রপট তা বদলাতে পারেনি। একটু পরই বাজে শেষের বাঁশি, কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমারসহ দলটির আরও অনেকে।
এই নিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের সবশেষ সাতটি নকআউট ম্যাচের প্রতিটিতে ইউরোপিয়ান দলের বিপক্ষে হারল ব্রাজিল।
আর নরওয়ের বিপক্ষে এই পর্যন্ত পাঁচটি ম্যাচ খেলে তিনটিতেই হারল ব্রাজিল, বাকি দুটি ড্র। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে লাতিন আমেরিকার দলটিকে একই স্কোরলাইনে হারিয়েছিল নরওয়ে।