সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন সম্পন্ন

রিপোর্টার নামঃ
  • শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

অনুসন্ধান ডেস্ক ::: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, সিলেটের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশে একটি বিরল ঘটনা। যদি সিলেটের মতো বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই সম্প্রীতি থাকতো তবে আজ সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের কথা শোনা যেত না। সিলেটবাসীর প্রতি আমার একটাই অনুরোধ, কে কোন দল করেন সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। সিলেট বিভাগ দিয়ে আমরা প্রমাণ করতে চাই, দেশের অন্যান্য অঞ্চল যেন সিলেটিদের মত ঐক্যবদ্ধভাবে এক হয়ে বাংলাদেশ গড়তে কাজ করেন।

শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে নগরীর মেন্দিবাগস্থ জালালাবাদ গ্যাস অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলার দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, দেশ আমাদের সবার। আমরা সবাই বাংলাদেশি। আমাদের দেশে একটি গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে কাজ করছে। আমাদেরকে চোখ-কান খোলা রেখে সজাগ থাকতে হবে, যেন তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দেশকে সামনে দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সত্যিকার অর্থে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।

নিজের মেয়র থাকাকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সমর্থন আমি কখনো ভুলব না। বিশেষ করে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ সিলেটের সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। সম্মেলনে উত্থাপিত বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, প্রশাসনে প্রতিনিধিত্ব, সুনামগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনাসহ যেসব বিষয় উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর করব। প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, সম্মেলনে আসার আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় আটটি মন্দির ও চারটি শ্মশানঘাটের সংস্কারকাজ চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব কাজ শেষ হওয়ার আশা করছি। পাশাপাশি জয়ন্তিয়া রাজবাড়িকে জাদুঘরে রূপান্তরের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পদে সংখ্যালঘুদের বৈষম্যের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগ কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের মতো সিলেটবাসীর প্রতিও কৃপণতা দেখানো হচ্ছে। এটা করতে দেয়া হবে না, বৈষম্য থাকতে দেয়া যাবে না। আমাদের মৌলিক অধিকার যেন আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা শ্যাম পুরকায়স্থ চয়নের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রঞ্জন চন্দ্র ঘোষের পরিচালনায় সম্মেলনে উদ্বোধকের বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বাসুদেব ধর। তিনি বলেন, ৩০ লাখ প্রাণ, ২ লাখ মা বোনের ইজ্জত ও আত্মাহুতি এবং ধ্বংসের বিনিময়ে যে দেশটি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, সে দেশে আমাদের সবার স্বপ্ন ছিল সমান অধিকার নিয়ে বাঁচবো। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র ও সরকার হবে সবার। একটি পর্যায়ে এসে মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনাটি মুখ থুবড়ে পড়ল এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ঘনিয়ে এলো অন্ধকার সময়। সেই সময় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল পূজা উদযাপন পরিষদের। আমাদের এই পথ চলা সহজ ছিল না। তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের আন্দোলনে মেজর জেনারেল সি আর দত্ত বীর উত্তমদের যদি আমরা প্রথম প্রজন্ম ধরি, তাহলে আমরা হলাম দ্বিতীয় প্রজন্ম। আগামী দিনে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমাদের তৃতীয় প্রজন্মকে শক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। এই মাটিতে আমাদের জন্ম, আমাদের পূর্বপুরুষরা এখানে নিশ্বাস নিয়েছিলেন এবং এই মাটির শ্মশানেই শুয়ে আছেন। এই মাটির অমর্যাদা আমরা হতে দিবো না। পূজা উদযাপন পরিষদ এই চেতনাকে ধারণ করেই এগিয়ে চলছে। তিনি এই আন্দোলনে নারী সমাজকে আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা। তিনি বলেন, কোন রাষ্ট্র, সংবিধান ও সরকার যদি সাম্প্রদায়িক হয়, তাহলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকে না। তাই সংবিধানে যেন কোন সাম্প্রদায়িক চিহ্ন না থাকে। আমরা এদেশের ৯০ ভাগ মুসলমানদের সাথে সৌহার্দ রেখে পথ চলতে চাই। তবে কেবল আমরা নই, আপনাদেরও সৌহার্দ্য দেখাতে হবে। আমরা চাই, মব সৃষ্টি করে যেন আর এদেশে কোন সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা না ঘটে।

সম্মেলনে সম্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা জয়ন্ত সেন দীপু, সহ-সভাপতি ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, সহ-সভাপতি মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা, সাংগঠনিক সম্পাদক প্রাণতোষ আচার্য্য শিবু। বক্তব্য রাখেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মলয় পুরকায়স্থ, ঐক্য পরিষদ সিলেট জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট বিজয় কৃষ্ণ বিশ^াস, পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্য্য, সিলেট মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুব্রত দে, ঐক্য পরিষদ সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক কৃপেশ পাল, ঐক্য পরিষদ সিলেট মহানগরের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দেব, সিলেট মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাস, মৌলভীবাজার পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহিম দে, ঐক্য পরিষদ মৌলভীবাজার জেলার সাধারণ সম্পাদক নকুল চন্দ্র দাস প্রমুখ। শুরুতে পবিত্র গীতা পাঠ করেছেন সৃষ্টি চন্দ এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন পূজা পরিষদ সিলেট জেলার সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রিংকু চক্রবর্তী। সম্মেলনে

অনুষ্ঠানে পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলার প্রয়াত নেতাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন প্রচার সম্পাদক রজত কান্তি চক্রবর্তী। এছাড়া অনুষ্ঠানে সম্পাদনা পরিষদের সদস্য সচিব দীপক কুমার দাস এর পরিচালনায় ‘স্বাধিকার’ শীর্ষক ম্যগাজিনের মোড়ক উন্মোচন উদ্বোধক ও অতিথিবৃন্দ।

এর আগে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সকাল ১১টায় সিলেট জেলার দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন শুরু হয়। জাতীয় পতাকা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বাসুদেব ধর। সম্মেলনে সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলার নেতৃবৃন্দ মিছিল সহকারে যোগদান করেন এবং সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সিলেট পূজা উদযাপন পরিষদের আগামী দুই বছরের জন্য নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা শ্যাম পুরকায়স্থ চয়ন এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন দীপক কুমার দাস।

আরো সংবাদ পড়ুন
© All rights reserved © 2021 Anushondhan News
Developed by Host for Domain