শিরোনাম :
আ.লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৭ শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিল ট্রাইব্যুনাল সিলেটে এসে দুই ওলির মাজার জিয়ারত করলেন রাষ্ট্রপতি সিলেটে রাষ্ট্রপতি, পথেপথে অভ্যর্থনা রাষ্ট্রপ্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট আগমন উপলক্ষে মহানগর তাঁতী দলের প্রস্তুতি সভা তিন বছর পর সিলেটে শুরু হচ্ছে বাণিজ্য মেলা সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত ‎সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখার পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত রাষ্ট্রপতির সফর নির্বিঘ্ন করতে সিলেটে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা-লিশ কমিশনার সিলেটে হামে একদিনে ৪ শিশুর মৃত্যু মৌলভীবাজারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে টমটম, চালক নিখোঁজ

আ.লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৭ শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিল ট্রাইব্যুনাল

রিপোর্টার নামঃ
  • মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’

 

অনুসন্ধান ডেস্ক ::: জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সাজাপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরাও।

সোমবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলায় দণ্ডিত অন্যরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

তাদের মধ্যে সাদ্দাম ও ইনান ছাড়া বাকিদের অর্ধেক সম্পদ জব্দ করে জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের সহায়তা করতে বলা হয়েছে।

এ মামলায় গত ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। সেদিন আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চায় প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। পরে এ মামলার পলাতক সাত আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ইশরাত জাহান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে পলাতক থাকা ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে গত ২২ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচারকাজ। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র নিহত শরিফ ওসমান বিন হাদি, তদন্ত কর্মকর্তাসহ এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ২৯ জন। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ৪ আগস্ট শুরু হয় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন।

প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সাংবাদিকদের বলেন, বেশ কিছু কলরেকর্ড, ডকুমেন্টারি এভিডেন্স, জাতিসংঘের প্রতিবেদনসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সাতজনের বিরুদ্ধে মূলত অভিযোগ ছিল—হত্যার নির্দেশ, উসকানি ও ষড়যন্ত্র। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ডেকে আন্দোলনকারীদের ওপর যেন আওয়ামী লীগের সশস্ত্র নেতা-কর্মীরা হামলা করে, তাদের হত্যা করে, সে জন্য নির্দেশনা দিতেন, পরামর্শ দিতেন, উসকানি দিতেন। তিনি বলেন, প্রসিকিউশন প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধেই আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করে প্রসিকিউশন।

কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
ওবায়দুল কাদের: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?” অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই ধানমন্ডির দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে ব্যবহারের নির্দেশ দেন তিনি। আন্দোলন দমনে ইন্টারনেট ধীর করা, পুলিশ-র‌্যাবকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ এবং ১৯ জুলাই ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে ফোনালাপেও আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম: অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ৯ ও ১৫ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে বসে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ ও প্ররোচনা দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। অভিযোগে বলা হয়েছে, নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনের বিষয়টি তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি করতেন এবং তার নির্দেশে সেখানে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৪ আগস্ট ফার্মগেইটে আন্দোলনকারীদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী ও সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাহাউদ্দিন নাছিমের প্ররোচনায় নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-৮-এ সশস্ত্র হামলায় ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটে।

মোহাম্মদ আলী আরাফাত: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৩ ও ১৯ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে মহড়া দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঢাকা-১৭ আসনের মহাখালী ও গুলশান এলাকায় হামলা চালিয়ে একাধিক আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। এছাড়া আন্দোলন দমনে সরকারের বল প্রয়োগের খবর প্রচার করায় কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৮ ও ২২ জুলাই কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের ঘটনায় তার ভূমিকা ছিল।

শেখ ফজলে শামস পরশ: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, যুবলীগ চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ ফজলে শামস পরশ তার অধীনস্থ নেতাকর্মীদের ‘সশস্ত্র অবস্থায়’ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তার নির্দেশ ও নেতৃত্বে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলন চলাকালে হামলা চালায়। ১৮ জুলাই সারা দেশে গুলিতে অন্তত ২৩ জন নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হওয়ার কথাও অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে। পরশের বিরুদ্ধে ১ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মাইনুল হোসেন খান নিখিল: অভিযোগপত্র অনুযায়ী, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১২ জুলাই সিলেটে ‘উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যুবলীগ নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন মাইনুল হোসেন খান নিখিল। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় অংশ নেওয়া এবং ১৯ জুলাই মিরপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নিখিলের সরাসরি নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।

সাদ্দাম হোসেন: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি দেন। ওবায়দুল কাদেরের কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে আন্দোলন দমনে দলীয়ভাবে পরিকল্পনা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১১ জুলাই বিকালে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাদ্দামের ফোনালাপ হয় এবং সেখানে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের নিয়ে হামলায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া এবং আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দামের বক্তব্যের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে।

শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান: অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’র নামে আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় হেলমেট পরা অবস্থায় মাঠে থেকে তা সরাসরি তদারকি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আল জাজিরায় ফাঁস হওয়া কথোপকথনে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে তা সারাদেশে বাস্তবায়নের বিষয়টি উঠে আসে।

অভিন্ন ধারা ও অভিযোগ সবার বিরুদ্ধে
সাত আসামির বিরুদ্ধেই ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিদের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা ও সম্পৃক্ততায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়।

অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে সাতজনকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(ক), (গ), (হ) এবং ৪(১), (২), (৩) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আরো সংবাদ পড়ুন
© All rights reserved © 2021 Anushondhan News
Developed by Host for Domain