শিরোনাম :
একটার পর একটা অঘটন ঘটবে, আমরা কি বসে থাকবো- প্রশ্ন শফিকুর রহমানের ৫ম বারের মতো প্রকাশ্যে গণনা হচ্ছে সিলেট শাহজালাল (র.) মাজারের টাকা প্রবারণা: ধর্মীয় অনুশাসন, আত্মশুদ্ধি ও ফানুস উৎসবের ঐতিহ্য বৃহত্তর মাসুক বাজার উপদেষ্টা কমিটি গঠন উপলক্ষে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ‎ সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর নির্বাচন সম্মেলন দক্ষিণ সুরমার পারাইরচকে ‘স্ট্রাইক হাউজ ইনডোর ফুটবল মাঠ’-এর উদ্বোধন সিলেটে হামে মৃত্যু ২০০ গত ২৪ ঘন্টায় মারা গেছে ৩ জন সিলেটে খুন হওয়া যুবদল নেতার বাড়িতে মন্ত্রী আরিফ, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে নিসচা সিলেট মহানগরের র‌্যালী ভারত যাওয়ার সময় জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গ্রেপ্তার

প্রবারণা: ধর্মীয় অনুশাসন, আত্মশুদ্ধি ও ফানুস উৎসবের ঐতিহ্য

রিপোর্টার নামঃ
  • শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

লেখক: উৎফল বড়ুয়া ::: প্রবারণা বৌদ্ধধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুশাসন ও উৎসব। এটি আত্মানুসন্ধান, আত্মশুদ্ধি ও আত্মসমর্পণের এক তাৎপর্যপূর্ণ তিথি। গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘের জন্য তিন মাসের বর্ষাবাস ব্রত সমাপ্তির পর প্রবারণা পালনের যে অনুজ্ঞা প্রদান করেছিলেন, সেই ঐতিহ্য আজও যথাযথ শ্রদ্ধা, ধর্মীয় মর্যাদা ও আন্তরিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। বর্ষাবাসের তিন মাস ভিক্ষুসংঘ সদ্ধর্মাচারের গভীর অনুধ্যান ও অনুশীলনে ব্যাপৃত থাকেন। এ সময় ভিক্ষুরা একই বিহারে অবস্থান করেও সংযম, শৃঙ্খলা ও ধর্মচর্চায় একাগ্র থাকার চেষ্টা করেন। বর্ষাবাসের মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মসংযম, চিত্তের পরিশুদ্ধি এবং ধর্মীয় অনুশাসনের যথাযথ অনুসরণ। এই সময়ের সাধনা ও অনুশীলনের পর বর্ষাবাস সমাপ্তির তিথিতে প্রবারণা পালিত হয়। গৌতম বুদ্ধ শ্রাবস্তীর অনাথপিণ্ডিক শ্রেষ্ঠীর জেতবন আরামে অবস্থানকালে কৌশল জনপদে বর্ষাবাস পালনকারী ভিক্ষুসংঘের জীবনাচার সম্পর্কে অবগত হন। পরবর্তীকালে বর্ষাবাস শেষে ভিক্ষুসংঘের পারস্পরিক আত্মসমালোচনা, ত্রুটি স্বীকার এবং বিনয়ানুগ জীবনচর্চাকে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে প্রবারণার বিধান প্রবর্তিত হয়। সেই থেকে প্রবারণা ভিক্ষুসংঘের ধর্মীয় জীবন ও বিনয়াচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।

প্রবারণা শব্দের শাব্দিক অর্থ প্রকৃষ্টভাবে বারণ করা বা নিষেধ করা। বৌদ্ধধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর তাৎপর্য আরও গভীর। মানুষের আচরণগত ত্রুটি, নৈতিক স্খলন এবং চিত্তের কলুষ—লোভ, বিদ্বেষ ও মোহ—দূর করার অঙ্গীকারই প্রবারণার অন্যতম শিক্ষা। মানুষের জীবনে নৈতিক অবক্ষয় ও মানসিক অশান্তির অন্যতম কারণ হলো এই তিনটি ক্লেশ। এগুলো মানুষের শুভবোধ, বিবেক ও প্রজ্ঞাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তাই জীবনের প্রকৃত কল্যাণ অর্জনের জন্য চিত্তকে কলুষমুক্ত করা এবং সৎচিন্তা ও সৎকর্মের পথে পরিচালিত করা অপরিহার্য। প্রবারণার আরেকটি তাৎপর্য হলো ‘বরণ’—অর্থাৎ শুভ, শুদ্ধ, সুন্দর ও সৎ আচরণকে গ্রহণ করা। বৌদ্ধ পরিভাষায় বলা যায়, অকুশলকে বারণ এবং কুশলকে বরণ করাই প্রবারণার মূল শিক্ষা। এ শিক্ষা কেবল ভিক্ষুসংঘের জন্য নয়; বরং সমাজের প্রত্যেক মানুষের নৈতিক ও আত্মিক উন্নয়নের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রবারণা শুধু কৃতকর্মের ত্রুটি সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের আচরণে সংঘটিত কোনো অপরাধ বা ত্রুটি সম্পর্কে সন্দেহ, আশঙ্কা কিংবা অন্যের দৃষ্টিতে প্রতীয়মান কোনো বিচ্যুতির বিষয়েও সচেতন হওয়ার শিক্ষা এতে নিহিত রয়েছে। ত্রিপিটকের মহাবর্গে ভিক্ষুদের দৃষ্ট, শ্রুত কিংবা আশঙ্কিত ত্রুটি সম্পর্কে প্রবারণা করার নির্দেশনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে আত্মসমালোচনা, পারস্পরিক সংশোধন এবং বিনয়ানুগ জীবনযাপনের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রবারণার অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সংঘজীবনে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, দায়বদ্ধতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। এই তিথিতে ভিক্ষুরা পরস্পরের কাছে নিজেদের দৃষ্ট, শ্রুত অথবা আশঙ্কিত ত্রুটির বিষয়ে সংশোধনের সুযোগ প্রদান করেন এবং প্রয়োজনে বিনয়ানুসারে প্রতিকার গ্রহণ করেন। এ প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিবর্তে আত্মসমালোচনা, অহংকারের পরিবর্তে বিনয় এবং বিরোধের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা বিকশিত হয়। নিজের ভুল স্বীকার করা এবং অন্যের গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ করা আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। সুতরাং প্রবারণার সরলীকৃত স্বরূপ হলো আত্মশুদ্ধি ও ধর্মীয় উৎসবের সমন্বয়। এর মধ্য দিয়ে ভিক্ষুসংঘের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, বিনয়ানুবর্তিতা বৃদ্ধি পায় এবং সংঘের সামগ্রিক পবিত্রতা রক্ষার পথ প্রশস্ত হয়। এ কারণেই বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের জীবনে প্রবারণার গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে ফানুস উৎসবের সংযোগ কখন এবং কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া কঠিন। বৌদ্ধ শাস্ত্রে প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উত্তোলনের সরাসরি উল্লেখও সুস্পষ্ট নয়। ফলে এ উৎসবের উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে বিভিন্ন মত, লোকবিশ্বাস এবং ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, প্রাচীনকালে কাগজের ব্যবহার, চিত্রশিল্প এবং বিভিন্ন লোকজ উৎসবের প্রচলন সম্পর্কে নানা ঐতিহাসিক সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়। তবে বর্তমান সময়ে ফানুস তৈরিতে ব্যবহৃত মসৃণ ও পাতলা কাগজের অনুরূপ উপকরণ তখন কতটা প্রচলিত ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। একইভাবে, বুদ্ধের সময়ে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বর্তমান রীতিতে ফানুস উত্তোলনের প্রচলন ছিল কি না, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ সুস্পষ্ট নয়। জাতক সাহিত্যে কার্তিকোৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হতো বলে বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। এ উৎসব কয়েক দিনব্যাপী স্থায়ী হওয়ার কথাও প্রচলিত রয়েছে। বর্ষাবাস সমাপ্তির পর ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের যে পরিবেশ সৃষ্টি হতো, তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে বিভিন্ন আনন্দোৎসবের সংযোগ গড়ে উঠতে পারে বলে অনুমান করা হয়। বর্ষাবাস পালনের সময়কাল ও প্রথাগত বিধানের সঙ্গে কঠিন চীবর দানেরও একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রবারণার পর থেকে কঠিন চীবর দানের মৌসুম শুরু হয়। এ সময় বৌদ্ধসমাজে দান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক মিলনমেলার আয়োজন দেখা যায়। এসব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের ধারাবাহিকতায় প্রবারণা পূর্ণিমা আজ একটি বৃহত্তর সামাজিক উৎসবের রূপ লাভ করেছে। তবে ফানুস উৎসবের উৎপত্তি সম্পর্কে শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ফলে এর ইতিহাস ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে প্রামাণ্য তথ্য, ঐতিহ্যগত বিশ্বাস ও অনুমানকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বৌদ্ধসমাজে প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উত্তোলনকে কেন্দ্র করে একটি গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তির ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুসারে, আকাশে প্রজ্বলিত ফানুসের আলোকধারার মাধ্যমে আকাশস্থিত গৌতম বুদ্ধের চুলগুচ্ছকে বন্দনা জ্ঞাপন করা হয়। এই বিশ্বাসের সঙ্গে বৌদ্ধদের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি নিবিড়ভাবে জড়িত। যদিও ফানুস উত্তোলনের এই ব্যাখ্যার পক্ষে সুস্পষ্ট শাস্ত্রীয় প্রমাণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবু বৌদ্ধসমাজে এটি দীর্ঘদিন ধরে লালিত একটি ঐতিহ্যগত বিশ্বাস। প্রজ্বলিত ফানুসের আলো তাই শুধু একটি বাহ্যিক দৃশ্য নয়; এটি ভক্তি, শ্রদ্ধা, পুণ্যচেতনা ও শুভকামনার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। ফানুস যখন অন্ধকার আকাশে আলোর রেখা সৃষ্টি করে ওপরে উঠে যায়, তখন তা মানুষের মনে শুভবোধ, আশাবাদ ও কল্যাণের প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলে। এই প্রতীকী অর্থে ফানুসের আলো মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে প্রজ্ঞা ও মানবিকতার আলোয় জীবনকে আলোকিত করার আহ্বান জানায়।

বর্তমানে প্রবারণা পূর্ণিমার ফানুস উৎসব বৌদ্ধসমাজের একটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধর্মীয় অনুষঙ্গের পাশাপাশি সামাজিক আনন্দোৎসব হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এ উৎসব উপভোগ করতে জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বৌদ্ধ বিহারগুলোতে সমবেত হন। এই সর্বজনীন অংশগ্রহণ প্রবারণা পূর্ণিমার সামাজিক তাৎপর্যকে আরও বিস্তৃত করেছে। ফানুস উৎসব মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও একটি উৎসবকে ঘিরে মানুষের সম্মিলন প্রমাণ করে যে, মানবিক মূল্যবোধ ও শান্তির আকাঙ্ক্ষা সর্বজনীন। ফানুস উৎসবের এই ঐতিহ্যকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে এর ধর্মীয় তাৎপর্য, সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও প্রচলিত বিশ্বাস সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করে তোলাও জরুরি। ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে ইতিহাসের তথ্য ও লোকবিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন করতে পারলে এই উৎসবের মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে।

প্রবারণা পূর্ণিমা আমাদের আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি, বিনয় ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত ধর্মাচরণ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের চিন্তা, আচরণ ও জীবনযাপনে তার প্রতিফলন ঘটানোই ধর্মের মূল উদ্দেশ্য। লোভ, বিদ্বেষ ও মোহ পরিহার করে মৈত্রী, করুণা, প্রজ্ঞা ও সহমর্মিতার চর্চার মধ্য দিয়েই ব্যক্তি ও সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অন্যদিকে, প্রবারণা পূর্ণিমার ফানুস উৎসব বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য সংযোজন। আকাশে উড়ে যাওয়া আলোকিত ফানুস যেন পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের বার্তা বহন করে। এর আলো আমাদের মনে করিয়ে দিক—অন্ধকার যত গভীরই হোক, সম্মিলিত প্রচেষ্টা, শুভচিন্তা ও মানবিকতার মাধ্যমে আলোর পথ নির্মাণ করা সম্ভব।

সম্প্রীতির প্রবারণায় আলোকিত হোক পৃথিবী। দূর হোক পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার। বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, মানবতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি; মানুষের চেতনা উদ্ভাসিত হোক প্রজ্ঞার আলোয়।

লেখক পরিচিতি: প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ, জাতীয় কমিটি; সংগঠক ও মানবাধিকারকর্মী।

আরো সংবাদ পড়ুন
© All rights reserved © 2021 Anushondhan News
Developed by Host for Domain