শিরোনাম :
সিলেটে ট্রিপল মার্ডার: যেভাবে ‘রহস্য উদঘাটন’ করল পুলিশ গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন সড়ক পরিদর্শন করলেন মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী কাপড় কাটার টেবিল থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫, নাঈমের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া সিলেটে ইনসাফ ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ সোসাইটির সভা ও বৃক্ষরোপণ-গাছের চারা বিতরণ সিলেটে গৃহকর্মীর প্রেমের বলি সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতি সিলেটে সুনামগঞ্জ জেলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের আত্মপ্রকাশ জাফলংয়ে শূন্য বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও স্কুল বহির্ভূত শিশু নিশ্চিতে সচেতনতামূলক সভা চার সন্তান বিদেশে, নিজ ঘরে গৃহকর্মীসহ ব্যবসায়ী দম্পতি খুন কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত তারা মিয়ার মরদেহ হস্তান্তর সিলেট জেলা ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের মানববন্ধন

কাপড় কাটার টেবিল থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫, নাঈমের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া

রিপোর্টার নামঃ
  • বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

গোয়াইনঘাট ::: টিনের ঘরের এক কোণে কাপড় কাটার টেবিল। সেখানেই কখনো মায়ের সঙ্গে বসে কাপড় সেলাই করে নাঈমুর রহমান, আবার সেই টেবিলই হয়ে ওঠে তার পড়ার টেবিল। সংসারের অভাব, বাবার কর্মহীনতা আর পরিবারের সীমিত আয়-কোনোটিই তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দর্জির কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা করে এবার এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের রাজনগর গ্রামের ১৭ বছর বয়সী নাঈমুর রহমান।

নাঈম সোনারহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। এসএসসিতে ১ হাজার ২৫০ নম্বরের মধ্যে ১ হাজার ১৫৩ নম্বর পেয়েছে সে। গণিতে পেয়েছে ৯৯ নম্বর। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান তার প্রিয় বিষয়। তার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। এজন্য সে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে চায়।

তবে ভালো ফলাফলের আনন্দের মধ্যেও নাঈমের সামনে রয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা। উচ্চশিক্ষার খরচ চালিয়ে যাওয়া তার পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নাঈমের মা মোছাম্মৎ লাকি বেগম কাপড় সেলাই করে সংসারে আয় করেন। মায়ের কাছ থেকেই ছোটবেলায় দর্জির কাজ শেখে নাঈম। প্রায় পাঁচ বছর ধরে পড়াশোনার পাশাপাশি সে এ কাজ করে আসছে।

নাঈমের ভাষ্য, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা দর্জির কাজ করার পরও পড়াশোনাকে সে কখনো অবহেলা করেনি। কখনো কাপড় কাটার টেবিলেই বই নিয়ে বসেছে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবারের কাজে সহযোগিতা করেছে। তার মাসিক আয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। এই অর্থের একটি বড় অংশ পরিবারের প্রয়োজন ও তার পড়াশোনার পেছনে ব্যয় হয়।

নাঈম জানায়, ছোটবেলা থেকেই ভালো কিছু করার স্বপ্ন ছিল তার। সেই লক্ষ্য থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে। অভাবের কারণে কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হয়নি। তার ভাষায়, মনোবল ও লক্ষ্য ঠিক থাকলে কাজ ও পড়াশোনা-দুটিই সামলানো সম্ভব। এ কারণে বন্ধুদের আড্ডা ও অপ্রয়োজনীয় সময় কাটানো কমিয়ে সে নিজের লক্ষ্যে মনোযোগ দিয়েছে।
তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। নাঈমের আশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারের সহযোগিতা পেলে তার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে।

নাঈমের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বাবা আতিকুল রহমান দীর্ঘদিন মসজিদ ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে মানষিক অসুস্থতার কারণে তিনি কর্মহীন। তিন ভাইয়ের মধ্যে নাঈম দ্বিতীয়। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী মা ও নাঈম। প্রায় পাঁচ শতাংশ বসতভিটা ছাড়া তাদের উল্লেখযোগ্য জমিজমা নেই।
নাঈমের বাবা বলেন, ছোটবেলা থেকেই ছেলে পড়াশোনায় মনোযোগী। পরিবারের কাজেও সহযোগিতা করে। অনেক সময় রাত জেগেও তাকে পড়তে দেখেছেন। দারিদ্র্যের কারণে ছেলেকে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে হয়েছে। সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

মা লাকি বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই নাঈম পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহী। পরীক্ষার সময় অনেক পরিশ্রম করেছে। ফল প্রকাশের পর তার সাফল্যে পরিবারের সবাই আনন্দিত। তবে ছেলের উচ্চশিক্ষা কীভাবে চালাবেন, সেটিই এখন তাদের বড় চিন্তা। ছেলের স্বপ্ন পূরণে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করবেন বলেও জানান তিনি।
সোনারহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর ইকবাল বলেন, নাঈম বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। আর্থিক সংকটের মধ্যেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তার ফলাফল প্রমাণ করে, সুযোগ ও সহায়তা পেলে দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও ভালো করতে পারে।
নাঈমের সাফল্যের পেছনে তার মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করে সে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাজন চন্দ্র নাথও তাকে পড়াশোনায় উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন।

এদিকে নাঈমের কলেজে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি জানার পর ফ্রান্সপ্রবাসী স্থানীয় বাসিন্দা কালামিয়া তাকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। এতে আপাতত কলেজে ভর্তি হওয়ার পথ কিছুটা সহজ হয়েছে। তবে শুধু ভর্তি নয়, পরবর্তী সময়ে পড়াশোনা, বই-খাতা, যাতায়াত ও অন্যান্য শিক্ষাব্যয় চালিয়ে যাওয়া নিয়েও রয়েছে পরিবারের দুশ্চিন্তা। তাই নাঈমের উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখতে আরও সহযোগিতার প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজনগর গ্রামের তিনকক্ষের টিনের ঘরের একটি অংশে নাঈমের মা ও সে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করেন। কাপড় কাটার টেবিলেই চলে দর্জির কাজ, আবার সেখানেই পড়াশোনা করে নাঈম। সীমিত সুযোগের মধ্যেও তার এমন সাফল্যে প্রতিবেশীদের মধ্যেও প্রশংসা রয়েছে। স্থানীয়রা নাঈমের মতো মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার পর নাঈমের সামনে এখন নতুন অধ্যায়। দর্জির কাজ আর পড়াশোনার সংগ্রাম পেরিয়ে তার লক্ষ্য চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-অভাবের সঙ্গে লড়াই করে সে কতদূর এগোতে পারবে। আর সেই উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতার ওপর।

আরো সংবাদ পড়ুন
© All rights reserved © 2021 Anushondhan News
Developed by Host for Domain